শ্রীমা সারদাদেবী
শ্রীমা সারদাদেবী
সশক্তিক ভগবানই যুগধর্মপ্রবর্তনে সক্ষম হন; নতুবা নির্গুণ ব্রহ্মের পক্ষে জগদ্ব্যাপারে নিযুক্ত হওয়া কল্পনাতীত। নরাবতারে শক্তির আরাধনাপূর্বক তিনি তাঁহাকে উদ্বোধিত করেন; অনন্তর লোককল্যাণসাধনে নিযুক্ত করেন। এই প্রকারে ঈশ্বরারাধিতা শক্তি যুগে যুগে কৃপাসুমুখী হইয়া বিভ্রান্ত ও বিপর্যস্ত মানবসমাজের পুনরভ্যুত্থানের সূত্রপাত করেন। শুধু তাহাই নহে, শ্রীভগবান যখন নররূপে অবতীর্ণ হন তখন শক্তিও প্রায়ই নারীবেশে তাঁহার সহগামিনী হন।
শ্রীরামচন্দ্রের সহিত সীতাদেবী, শ্রীকৃষ্ণের সহিত শ্রীরাধিকা, বুদ্ধদেবের সহিত যশোধরা, শ্রীচৈতন্যের সহিত বিষ্ণুপ্রিয়ার আগমনে ইহাই প্রমাণিত হয়। ফলত আধ্যাত্মিক, আধিভৌতিক এবং আধিদৈবিক শক্তিরূপেই হউক, কিংবা নারীরূপেই হউক, অবতারের সহিত সংযুক্তা থাকিয়া শক্তি তাঁহার লীলাপ্রকাশে অশেষরূপে সহায় হন। শক্তিকে বাদ দিলে অবতারের দিব্য কার্যকলাপ অসম্ভব ও আমাদের নিকট অবোধ্য হইয়া পড়ে।
‘রামকৃষ্ণের উপাসনায় সন্তুষ্টা সেই দেবীকে বর্তমান যুগে পুনরায় মানবকল্যাণে নিরতা দেখিয়া পূজ্যপাদ আচার্য স্বামী বিবেকানন্দ আমাদিগকে উদাত্তকণ্ঠে আহ্বান করিয়াছেন, “যে শক্তির উন্মেষমাত্রে দিগ-দিগন্তব্যাপিনী প্রতিধ্বনি জাগরিতা হইয়াছে, তাহার পূর্ণাবস্থা কল্পনায় অনুভব কর এবং বৃথা সন্দেহ, দুর্বলতা ও দাসজাতিসুলভ ঈর্ষাদ্বেষ ত্যাগ করিয়া এই মহা-যুগচক্র পরিবর্তনের সহায়তা কর।”
সর্বানুস্যূতা ব্রহ্মরূপিণী সেই অদৃশ্যা আদ্যাশক্তি এই কালে আবার যুগাবতারের সহধর্মিণীরূপে অবতীর্ণা হইয়া একদিকে যেমন পরম পুরুষের লীলার পূর্তিবিধান করিয়াছেন, অপরদিকে তেমনি বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্বমহিমা বিস্তার এবং মানবসমাজ হইতে অকল্যাণ বিদূরণপূর্বক ভাবী ভারতকে, তথা সমগ্র বিশ্বকে, এক নব অভ্যুদয়ের রাজমার্গে তুলিয়া দিয়াছেন। তাই সশক্তিক শ্রীরামকৃষ্ণের করুণাপাঙ্গে কৃতার্থ স্বামী বিবেকানন্দ সবিনয়ে প্রণাম করিয়াছেন
দাস তোমা দোঁহাকার, সশক্তিক নমি তব পদে ।
ঈশ্বরের অবতরণের যেমন একটা ধারা আছে, শক্তির আবির্ভাবেরও তেমনি একটা রীতি আছে। অথবা অগ্নি ও তাহার দাহিকাশক্তির ন্যায় অভিন্ন ঈশ্বর ও ঈশ্বরশক্তির শরীরগ্রহণ একই উদ্দেশ্যে, একই কালে, একই নিয়মে হইলেও উহার কার্যসিদ্ধি পুরুষদেহাবলম্বনে এক প্রকারে এবং নারীদেহাবলম্বনে অন্য প্রকারে হইয়া থাকে । তাই সত্তার পার্থক্য না থাকিলেও করুণাময়ী শক্তির অবতারতত্ত্ব পৃথকভাবে আলোচনার একটা নিজস্ব সার্থকতা আছে।
অন্তর্জগতে সুবৃত্তি ও কুবৃত্তির মধ্যে যে অবিরাম সংঘর্ষ চলিতেছে, উপনিষদে তাহাকেও দেবাসুরসংগ্রাম নামে নির্দেশ করা হইয়াছে । আস্তিক্যবুদ্ধি, পরলোকচিন্তা, ধ্যাননিষ্ঠা প্রভৃতি সগুণরাশিকে নির্মূল করিবার জন্য বর্তমান যুগে অশ্রদ্ধা, জড়বাদপ্রিয়তা, ভোগপরায়ণতা প্রভৃতি আসুরিক গুণাবলী যে সমর ঘোষণা করিয়াছে, এবং যাহার ফলে ধর্মের গ্লানি, অধর্মের বৃদ্ধি এবং ঈর্ষা, দ্বেষ, কাম প্রভৃতির আধিক্যবশত লোকক্ষয়কারী যুদ্ধবিগ্রহ সংঘটিত হইতেছে, উহাই একালের দেবাসুর-সংগ্রাম ।
আধুনিক এই মনোরাজ্যের সংগ্রাম পৌরাণিক দেবদানবের যুদ্ধ অপেক্ষাও ঘোরতর। অতীতের সংঘর্ষ সাধারণত স্থূলজগতের গন্ডি অতিক্রম করিত না ; কিন্তু আধুনিক দ্বন্দ্ব অন্তর্জগতে উদ্ভূত ও দৈনন্দিন জীবনে প্রসারিত হইয়া মানবের মনুষ্যত্বের মূলে কুঠারাঘাত করিতে উদ্যত হইয়াছে । সুতরাং বর্তমানে শক্তির ক্রিয়া এবং অসুরসংহার প্রধানত মানসিক ক্ষেত্রে হওয়া আবশ্যক । আধুনিক জগতে সর্বাধিক প্রয়োজন নৈতিক উন্নতি এবং আধ্যাত্মিক অনুভূতির । অন্তরে একবার ভক্তি, বিশ্বাস ও পবিত্রতা পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত হইলে বাহিরের অবস্থা স্বতঃই তদনুযায়ী পরিবর্তিত হইবে। এই যুগে শক্তির অবতার তাই অন্তঃশত্রুর বিজয়ে ব্যাপৃত ।
বিজয় দুই প্রকারে হইতে পারে প্রথম, ক্ষমতার প্রয়োগে পাপসহ পাপীর ধ্বংসসাধন; দ্বিতীয়, সদ্গুণরাশির চমৎকারিত্বের দ্বারা শত্রুর চিত্ত আকর্ষণপূর্বক অসংকে সৎ-এ পরিবর্তিত করা । যুদ্ধে অরিবিনাশ অপেক্ষা সত্ত্বগুণের প্রভাবে তাহার মনোজয় করা অধিকতর শক্তির পরিচায়ক । তাই বর্তমান অবতারে অস্ত্রবাহুল্য, সিংহগর্জন বা সমরকোলাহল নাই – আছে শুধু লজ্জা, বিনয়, সদাচার, পবিত্রতা, কল্যাণস্পৃহা ও ঈশানুভূতি । আবার শুধু বিঘ্নাপসারণই দেবীর কর্তব্য নহে ; তাঁহাকে নবীন আদর্শ স্থাপন করিতে এবং নূতন উদ্দীপনা যোগাইতে হইবে । অরিসংহার দ্বারা ভক্তের সাধনমার্গ নিষ্কন্টক করার জন্য স্বয়ং ভগবানকে নামিয়া আসিতে হয় না; তাঁহার আংশিক বা গুণবিশেষের আবির্ভাবেই সে কার্য সাধিত হইতে পারে । কিন্তু মানবসমাজকে আধ্যাত্মিক অনুভূতির উচ্চতর সোপানে তুলিতে হইলে স্বয়ং ব্রহ্মশক্তিকেই কর্মক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইতে হয়।
ভারতের পুরাতন সংস্কৃতির পরিপ্রেক্ষিতে আজ ঐশী শক্তির আবির্ভাবে এক অভূতপূর্ব জাগরণের সম্ভাবনা দ্যোতিত হইয়াছে । বিশেষত নারী জগতে ইহার কার্য সুদূরপ্রসারী হইবে বলিয়া অনুমিত হয় । নারীসমাজের উন্নতির প্রয়োজন চিন্তাশীল ব্যক্তিমাত্রই স্বীকার করিবেন । আচার্য স্বামী বিবেকানন্দের কথার প্রতিধ্বনি করিয়া আমরা বলিতে পারি যে, মাতৃজাতির অভ্যুদয় ব্যতিরেকে ভারতের কল্যাণ সম্ভবপর নহে; একপক্ষে পক্ষীর উত্থান হয় না; সেইজন্য রামকৃষ্ণ-অবতারে স্ত্রীগুরুগ্রহণ, সেইজন্যই নারীভাবসাধন, সেইজন্যই স্বীয় সহধর্মিণীর শিক্ষা-দীক্ষার ভারগ্রহণ, সেইজন্যই মাতৃভাব প্রচার ।
বর্তমান যুগে [ ঊনবিংশ শতাব্দী ] এই দেশের আদর্শকে সঞ্জীবিত করার ও উহার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শনের একটা বিশেষ প্রয়োজন ছিল আর সে প্রয়োজন-সম্পাদন একমাত্র জগদম্বার পক্ষেই সম্ভব ছিল। কারণ ঊনবিংশ শতাব্দীতে অন্য কোন উপায়ে পরাধীন ভারতকে আত্মসংস্থ করা এবং সমস্ত বিশ্বকে এই প্রাণপ্রদ আদর্শ সম্বন্ধে অবহিত করা অপর কাহারও সাধ্যায়ত্ত ছিল। না। ভারতের মর্মকথা জগৎসমাজে প্রচারের ইহাই চিরন্তন পন্থা। সত্য কথা বলিতে গেলে, ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ হইতে এই শতাব্দীর প্রথম ভাগ পর্যন্ত ধর্মের অধোগতি যেমন সর্বাপেক্ষা অধিক হইয়াছে, শক্তির অবতরণও তেমনি সর্বোত্তম হইয়াছে। দেবী-গুরু-মাতৃজ্ঞানে এই শক্তির পূজার ভিতর দিয়াই নবীন সভ্যতার ভিত্তিপত্তন হইবে।
শ্রীশ্রীসারদাদেবীর জীবনী সেই ক্ষণিকচমকপ্রদ স্তরের নহে। কিন্তু যে মহান চরিত্রসমূহ নীরব সাধনের ফলে মানব- সংস্কৃতিকে উচ্চতর সুরে বাঁধিয়া দিয়া যায়, যাহাদের প্রভা সমসাময়িক দৃষ্টিতে ক্ষীণ মনে হইলেও দীর্ঘকালস্থায়ী হয় এবং ক্রমে বিস্তার লাভ করিয়া থাকে, শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরানীর পূত চরিত্র তাহাদেরই পর্যায়ভুক্ত। শুধু তাহাই নহে, সতী, সীতা প্রভৃতি যে সকল প্রাতঃস্মরণীয়াদের আগমনে ধর্মজীবনের পঙ্কিলতা বিদূরিত ও নবাভ্যুদয়ের সূত্রপাত হইয়াছিল, শ্রীমায়ের জীবনী তাঁহাদেরই সমশ্রেণীতে স্থাপনীয়।
সবই সত্য ; তবু প্রশ্ন জাগে, সমগ্র বিশ্বের জন্য যে শক্তির অবতরণ, তিনি নবীন সভ্যতা হইতে বিচ্ছিন্ন এক ক্ষুদ্র পল্লিকে আপনার পীঠস্থানরূপে নির্বাচিত করিলেন কেন? ইহার উত্তর কে দিবে? যাঁহার অচিন্ত্য মহিমায় জগতের সৃষ্টি, স্থিতি, লয় হইয়া থাকে, তাঁহার কয়টি কার্যের কারণনির্ণয়ে আমরা সমর্থ হই? তবু মানবুদ্ধি নিজের এই অপারগতা জানিয়াও অনুসন্ধানে বিরত হয় না। আমরা তাই ভাবি, জয়রামবাটীর কি কোন নিজস্ব মহিমা ছিল, যাহার ফলে সে এই সৌভাগ্যের অধিকারী হইল? বহু সন্ধানেও তেমন কিছু দৃষ্টিগোচর হয় না, শুধু ইতিহাসের পৃষ্ঠাগুলি আমাদিগকে স্মরণ করাইয়া দেয় যে, শ্রীকৃষ্ণের জন্ম কংসের কারাগারে এবং শৈশব, বাল্য ও কৈশোর গোপবালকমধ্যে ব্যয়িত হইয়াছিল ; যিশুখ্রিস্ট অশ্বশালায় জন্মগ্রহণ করিয়া সূত্রধরগৃহে লালিত হইয়াছিলেন ; শ্রীরামকৃষ্ণ অখ্যাতনামা কামারপুকুর গ্রামে ঢেঁকিশালে ভূমিষ্ঠ হইয়া দক্ষিণেশ্বরের মন্দিরে দেবলবৃত্তি স্বীকার করিয়াছিলেন। আর সমাজতাত্ত্বিকের সিদ্ধান্ত হইতে আমরা জানিতে পাই যে, দেশের নগরবাসী, শিক্ষিত ও ধনিক সম্প্রদায়ে চিন্তাবিপ্লব উপস্থিত হইলেও জাতীয় সংস্কৃতি বহুকাল যাবং পল্লির নিঃস্ব শান্তজীবন আশ্রয়পূর্বক আত্মরক্ষা করিয়া থাকে। বিশেষত ভারতীয় সংস্কৃতি দরিদ্র ব্রাহ্মণ ও কপর্দকহীন ধর্মগুরুদিগকে আধ্যাত্মিক উচ্চাসন ছাড়িয়া দিয়া আত্মরক্ষার এক অদ্ভুত উপায় আবিষ্কার করিয়াছে ! জয়রামবাটী কি সেই অধ্যাত্মসম্পদে গরীয়ান?
[ শ্রীমা সারদাদেবী
* স্বামী গম্ভীরানন্দ ]
